Snake bite

সঞ্জয় কোম্পানির একাউন্টস ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। আমার খুব কাছের বন্ধু – ওর মতন হাসি খুশি লোক খুব কম পাওয়া যায়। তবে ও আবার প্রচন্ড দুষ্টু – ওর মাথায় সর্বদা বিটকেল সব আইডিয়া মাথায় কিলবিল করে। সেই জন্য লোকজন ওকে আবার একটু ভয়ও পায় – কখন কাকে বোকা বানিয়ে দেবে, সেটা একমাত্র ও নিজেই জানে। তবে আমার সঙ্গে ওর একটা নিবিড় বন্ধুত্ব থাকার জন্য আমি ওর হিট লিস্টে নেই। সেটাই আমার একটা বড় প্রাপ্তি আর মনের শান্তি !

আই টি তে কাজ করলে আপনারা সবাই জানবেন “অনসাইট” যাবার কি মধু ! বিশেষ করে যদি এখন থেকে ১২-১৩ বছর আগে যেতে পারলে। সেই সময় বেশির ভাগ লোকজন বিয়ে করে ওঠে না – তাই অনাবিল স্বাধীনতা থাকে বিদেশের মাটিতে। দেশের মাইনে তো থাকেই, তার মধ্যে থাকে “পের্ ডিএম” নামক অমৃত। সেটা নিয়ে আপনি যদি কিপ্টে হন, তাহলে টাকা জমিয়ে, একটা ৭০ – ৯০ দিয়ে গুন্ করে দেশে ফিরে বাড়ি গাড়ি নারী – সবই জোগাড় করে ফেলতে পারেন। আবার আমার মতন হাত পাতলা হলে প্রচন্ডভাবে বিদেশ ঘুরে, চুটিয়ে খেয়ে দেয়ে বড় একটা ভুরি আর তার সঙ্গে কমপ্লিমেন্টারি কলেস্টেরল নিয়ে বাড়ি ফিরবেন বছর ২-৩ বাদে! মোট কথা, এই অনসাইট পেলে কেউ ছাড়তে চায় না অনেকেই।

সেই রকম শম্ভূ গেছে আমেরিকাতে – একদম একটা লম্বা ৫ বছরের অনসাইট পেয়ে। দিব্বি আছে সেখানে। মাঝে মধ্যেই দেখি খাওয়ার ছবি ফেসবুকে – জিজ্ঞেস করলে বলে ওখানে প্রত্যেক শনিবার পার্টি না করলে নাকি পুলিশ এসে হানা দেয় বাড়িতে ! বছরে একবার করে দেশে ফেরে ঠিক যীশু পূজার আগে – এসেই এখানে গোগ্রাসে বিরিয়ানি, নতুন গুড়ের সন্দেশ, রসগোল্লা খেয়ে আবার ফিরে যায় জানুয়ারির শুরুর দিকে। বছর তিনেক হয়ে গেছে – এখন ওর সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু কলেস্টেরল বাদে তৈরি হয়েছে সুগার এবং ছোট্ট দেখে একটা গলকম্বল – যেটা দেখে রাস্তার গরুও হিংসাতে লাল হয়ে যাচ্ছে।

গত বছরে জানুয়ারি মাসের শুরুতে অফিসে ওর সঙ্গে দেখা – অনেক গল্প হল। এরপরে ও বললো যে ওকে সঞ্জয়ের কাছে যেতে হবে মেডিকেল বিল দেবার জন্য। ১৫০০০ টাকা ট্যাক্স থেকে ছাড় পাবার জন্য বিল জমা দিয়ে আবার শনিবার বেরিয়ে যাবে আরও এক বছরের জন্য।

কিছুক্ষন বাদে দেখি শম্ভূ হাঁসতে হাঁসতে ফিরে এসে বললো “সঞ্জয় কি জিনিস গুরু !!!” আমি তো অবাক – জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে।

এবার শম্ভূর মুখেই শুনুন:

=====================================

“বছরে একবার করে অফিস আসি মেডিকেল বিল দেবার জন্য ১৫০০০ টাকার জন্য। দুই সপ্তাহে ১৫০০০ টাকা কি করে খরচ হবে শুনি ওষুধের জন্য ? তাই কি করি বল তো – পাড়ার দোকান থেকে প্রেসক্রিপশন, বিল – সবই জোগাড় হয় জানিস তো ? জানিস না ? একদম গবেট হয়েই রয়ে গেলি দেখছি !

যাই হক, আমার আবার একটু বেশি ল্যাদ জানিসই তো ! বেশি বিল জোগাড় করলে বেশি বার ভরতে হবে টুলের মধ্যে – তাই তিনটে প্রেসক্রিপশন, তিনটে বিল জোগাড় করলেই এই ১৫০০০ টাকা উঠে যায়! ওরে বাবা – অত হাঁ করে থাকিস না, মুখে মাছি ঢুকে যাবে !! আমি সঞ্জয়কে গিয়ে বলি পাড়ার কুকুরে আমাকে কামড়েছে, আমার বাবাকে কামড়েছে, এমনকি আমার মাকেও কামড়েছে। তাই তিনটে প্রেসক্রিপশন আর তিনজনের ওষুধ পত্তর কেনার খরচে ১৫০০০ টাকা হয়েই যায় !

এমনি করে দুই বছর দিব্বি চললো – আমি প্রত্যেক জানুয়ারিতে এই কুকুর কামড়ানোর বিল জমা করি – সঞ্জয় সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, তারপর বিল ছেড়ে দেয় – আর আমিও সময়মতো ট্যাক্সের ছাড় পেয়ে যাই।

দ্বিতীয় বছরে সঞ্জয় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল: “কি ভাই ? তোমরা কোথায় থাকো ? আমায় একটু বলবে ? আমি গিয়ে ওখানকার ধুলো মাথায় নেবো – আর কোন জায়গা নেই যেখানে তিনটে পাড়ার কুকুর পর পর তিন দিনে শুধু তোমাদের বাড়ির লোকেদের কামড়ায় !!”

আমি তখন একটু রেগে বললাম: “তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে শুনি ? চুপ চাপ নিজের কাজ করো !!”

ওতেই ও চুপ হয়ে গেলো – আমিও ভাবলাম আপদ মিটলো। আজকেও গেছি ও বছরের বিল জমা দিতে – সেই এক পদ্ধতি! সঞ্জয় সব আবার দেখলো – তারপর দেখি হঠাৎ জিজ্ঞেস করছে আমাকে:

সঞ্জয়: “ভালো আছ? পাড়ার কুকুরটি ঠিক আছে?”

আমিও ছাড়ার পাত্র নই – বললাম “ভালো আছি ! আগের কুকুরটা মরে গিয়েছিলো আমাদের কামড়ে – তবে এখন আবার নতুন কুকুর এসে উপদ্রব করছে”

সঞ্জয়: “সেকি ! এই বছরেও আবার কুকুর কামড়ালো নাকি ? সবাইকে ?”

আমি: “হ্যাঁ !!”

সঞ্জয়: “কি ব্যাপার বলো তো – প্রত্যেক বছর কামড়ায় ? কামড়ালে আবার বাড়ির ঠিক তিনজনকেই !! তাও আবার ক্যালেন্ডার দেখে ঠিক জানুয়ারির শুরুতেই ???”

আমি: “কি আর বলবো বলো !! এমন হতচ্ছাড়া কুকুরের দল দেখিনি !! ঠিক এই সময়েই কামড়ায় – আমি আর কি করতে পারি !”

সঞ্জয়: “ওহ হো !! মাসিমার আর মেসোমশাই এর গায়ে তো আর জায়গা বাকি নেই কুকুর কামড়ানোর ! তা – এবারেও কি তিনটে প্রেসক্রিপশন আর তিনটে বিল ?”

আমি: “কি করে বুঝলে বলো তো ? সত্যি ! তোমার মাথায় কি বুদ্ধি”

সঞ্জয়: “তা এতো কষ্ট করো কেন ? তিনটে প্রেসক্রিপশন আর তিনটে বিলের বদলে একটা বিলেই তো ব্যাপারটা করতে পারো !”

আমি: “কি করে শুনি ? তিনটে কুকুর কামড়ালে তো তিনটে করেই প্রেসক্রিপশন আর বিল লাগবে – তাই না?”

সঞ্জয়: “আরে না ! কুকুরের কথা বলছি না আর !! এইবার একটা গোখরো সাপ পোষো। সারাবছর ধরে একটু করে দুধ খাওয়াবে – আর ঠিক জানুয়ারী মাসে সাপটাকে ছেড়ে দেবে। তারপর দেখবে ও একটা কামড়ই দেবে তোমাকে। তখন একটা বিলেই দেখবে ১৫০০০ টাকা উঠে আসছে – আর মাসিমা, মেসোমশাই ও একটু নিস্তার পাবেন !!”

আমি এটা শুনে চুপ মেরে কেটে পড়লাম ওইখান থেকে।

কি জিনিস – সত্যি !! পরের বছর অন্য কিছু ভাবতে হবে !”

=====================================

Advertisements

2 thoughts on “Snake bite

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.