L14B

অনেকদিন পর লিখতে গেলে প্রথমে মনে হয় কি নিয়ে লিখি এইবার। কিন্তু হঠাৎ করে যদি আলোচনার বিষয় মাথায় এসে যায় – তাহলে আধ্যেক চাপ কমে যায়। আমার এই চাপটা থাকতো, যদি না সেদিন রাস্তায় কাকে বলতে শুনলাম L14B বাসের কথা বলতে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পরে গেল এক ঘটনা – সেটাই লিখছি এখন।

L14B বলে একটা বাস ছিল কলকাতা শহরে অনেক বছর আগে। এখন সত্যি বলতে ঠিক জানি না ওই বাস টা আদৌ চলে কি না – তবে সেই সময় খুবই পছন্দের রুট ছিল সল্টলেক এর বাসিন্দাদের জন্য। তখন আজকের দিনের সেক্টর ৫ বলে কিছু ছিল না – কলকাতার অফিস পাড়া বললে বোঝাতো ডালহৌসি এবং তার পরেই ধর্মতলা অঞ্চল। তাই কর্মব্যস্ততা মানেই ওই দুটি অঞ্চলে যাওয়া আর দিনের শেষে ওখান থেকেই বাড়ি ফেরা। এই L14B চলতো সল্টলেক করুণাময়ী থেকে একদম ধর্মতলা বাস স্ট্যান্ড অব্দি। তাই সবাই তীর্থের কাকের মতো এই বাসের জন্য অপেক্ষা করতো – এবং তার জন্য, বলা বাহুল্য, বাসের মধ্যে ভিড়টাও বেশ বেশিই হত।

আমি সেইদিন ধর্মতলাতে অফিস করে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছি। ভাদ্র মাসের পচা গরম – বাইরে দাঁড়ালেই কুল কুল করে ঘাম ঝরছে, স্বাভাবিক ভাবেই মন মেজাজ সবার একদম তুঙ্গে – পান থেকে চুন খসলেই গরম গরম কথাবার্তা বেরোচ্ছে সবার মুখ থেকে। বাড়িতে কাজ থাকার জন্য বেলা তিনটের সময় একদম ধর্মতলা বাস টার্মিনাস এ L14B বাসে বসে ঘামছি। ওই সময় বাস মোটামুটি ফাঁকা – শুধু আমার সামনে দুজন কলেজের ছাত্র বসে – কথাবার্তায় বুঝলাম যে কলেজ কেটে নিউ এম্পায়ার সিনেমায় কিছু একটা নুন শোতে দেখে বাড়ি ফিরছে।

বাস কবে ছাড়বে মা গঙ্গাই জানেন – সময় কাটানোর জন্য একই সঙ্গে ঘাম মুচ্ছি আর বাদাম কিনে খাচ্ছি। আরও এক দুজন ওঠার পর দেখলাম বাসের ড্রাইভার আর কন্ডাকটর উঠলো পান চিবোতে চিবোতে। বুঝলাম এইবার ছাড়বে বাস – অবশেষে !!

আমি লক্ষ্য করেছি যখনি একটা বাস ছাড়বে, ঠিক তখনি কোন একজন ছুটতে ছুটতে বাসে ওঠার চেষ্টা করবেই – ভগবান বোধয় ওই ভাবেই অলস বাঙালিকে এক্সারসাইজ করান ! ঠিক তাই হল – বাস এগোতে শুরু করেছে, সেই সময় এক প্রৌঢ় বাসের পিছন দিক থেকে ছুটতে ছুটতে জিজ্ঞেস করছেন “দাদা ! কত নম্বর ?” জানালার ধারে বসে সেই দুই কলেজের ছাত্র নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল – শুনতেই পাচ্ছে না কাকু কি জিজ্ঞেস করছে।

কাকুও এইবার ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন – এই বাসটি যদি উনি মিস করেন, তাহলে পরের বাস কখন আসবে সেটা উপরওয়ালাও চিন্তায় পরে যাবেন উত্তর দিতে। তাই বেশ বিরক্তি এবং উৎকণ্ঠার সঙ্গে ওই দুই ছাত্র কে আবার জিজ্ঞেস করলেন “ও ভাই ! এটা কত নম্বর ?”

“কি ?”

“বলছি – এটা কত নম্বর?”

“লঁ ১৪’র খ”

“তার মানে ?”

“বললাম তো লঁ ১৪’র খ”

ততক্ষনে এই সব কথোপকথন শুনে কন্ডাকটর মশায় “আস্তে লেডিস” বলে বাস টাকে থামিয়ে কাকুকে বললেন “L14B এটা – সল্টলেক যাচ্ছে – আপনি কোথায় যাবেন?”

ঘর্মাক্ত কাকু উত্তর শুনে হাঁপাতে হাঁপাতে খালি বাসে উঠে একটা জায়গাতে বসে একটু জিরিয়ে নিয়ে ওই দুই ছাত্রের উদ্দেশে বললেন “কি ভাই? মানুষের উপকার করতে শেখোনি? তোমাদের কতবার জিজ্ঞেস করছি এটা কত নম্বর – তা সেটা বলতে কি অসুবিধা হয় শুনি ? এই L14B টা মিস করলে আমাকে হয়তো এক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হত !”

“কেন কাকু ? আমরা তো বললাম এটা লঁ ১৪’র খ – শোনেননি ?”

কাকু একটু চুপ মেরে গেলেন – হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন ছেলেগুলো হঠাৎ খালি লঁ ১৪’র খ কেন বলছিলো – কারণ ঠিক পাঁচ মিনিট পর শান্ত অলস বিকেলটা হটাৎ অশান্ত হল কাকুর চিৎকারে:

“ডেপো ছেলে কোথাকার ! বাপের বয়েসী লোকেদের সঙ্গে ইয়ার্কি মারা ?? L14B কে লঁ ১৪’র খ বলা ?? আমার সঙ্গে মস্করা করা !! হতচ্ছাড়া বেয়াদপ ডেপো ছেলে সব !!!”

সেই থেকে L14B বাস টা আমার স্মৃতিতে একদম খোদাই হয়ে আছে।



Categories: Indian events, Life

Tags: , , , ,

2 replies

  1. বেশ, পুরোনো গল্পো মনও পড়ে গেলো।

  2. Reminded me of S23 another iconic bus to go to Esplanade once the bye pass opened up

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: