Unfair competition

স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ঢুকলে মনে হয় যেন রাজ্য জয় করে ফিরছি – তাই না? পাখির পাখনা গজিয়েছে – ইচ্ছা হলে উড়বে, আবার ইচ্ছা না হলে ক্লাসে বসে থাকবে। এ যেন জীবনের রাস্তায় যেতে যেতে প্রথম বড়ো হয়ে ওঠার আস্বাদ পাওয়া – এবং একবার এই স্বাদ পেলে লোকে অন্য কিছু চাই না। এই সময়টা বোধহয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় – স্বাধীনতা আছে পুরো দমে, কিন্তু দায়িত্বর বোঝা তখন ঘাড়ে এসে পড়েনি। এই সময়ের বন্ধু বান্ধব সারা জীবনের বন্ধু হিসেবে টিকে থাকে – কারণ এই সময় অত ইগো থাকে না, থাকে শুধু একসঙ্গে মজা করা এবং একে অপরকে সাহায্য করা।

দাদাদের কাছে এই সব গল্প শুনেই অভিক একদম চঞ্চল হয়ে আছে কলেজের প্রথম দিনটার জন্য। প্রচুর পড়াশোনা করে, জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে সামনের মাসে ভর্তি হবে উনিভার্সিটিতে। একটা অচেনার আনন্দ নিয়ে ভর্তিও হয়ে গেল ঠিক ঠাক। নতুন পরিবেশ – তার মধ্যে আবার রাগ্গিং এর ভয়। প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ ক্লাস করেই বাড়ি চলে যেত পিছনের গেট দিয়ে – যাতে সিনিয়ররা দেখতে না পায়। বেশ কয়েকটা বন্ধুও হয়ে গেছে এর মধ্যে – মাঝে তো একদিন মেকানাস গোল্ড সিনেমাটা দেখে এসেছে বন্ধুরা মিলে। সব মিলিয়ে আস্তে আস্তে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে অভীক।

একটাই শুধু রাগ হত ওর মধ্যে – সবাই পড়াশোনা করেই ঢোকার সুযোগ পায়, কিন্তু যারা এস সি এস টি – তারা কেন অনেক কম নাম্বার পেয়ে ওর চেয়েও ভালো স্ট্রিমে চান্স পাবে? গরিব ছেলে হলে না হয় বোঝা যায়, কিন্তু যাদের অনেক টাকা, যাদের টাকার জন্য পড়াশোনা করতে কোনোদিন বন্ধ হয়নি, তারা কেন এই সুযোগ পাবে? রাগ হয় এদের উপর – ব্যক্তিগত রাগ নয়, তবে এই অন্যায় নিয়মের জন্য রাগ অনেকেরই হয়। “এস সি এস টি” র পুরো নাম সবাই জানে – কিন্তু ওরা নাম দিয়েছিলো সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো – এটাই ঠিক নাম বলে মনে হত অভিকের।

এই করে প্রায় মাস ছয়েক কেটে গেছে। বোকা বোকা রাগ্গিং হলেও ওর খুব একটা রাগ হয়নি – বরঞ্চ আনন্দই করেছে সিনিয়র দের সঙ্গে মিশতে। এখন কলেজের ক্যাম্পাস নিজের বাড়ির মতন হয়ে উঠেছে – সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লাগছে অভিকের। কলেজের কাছেই একটা পেয়িং গেস্ট হিসাবে একটা বাড়িতে আছে – কাকু কাকিমা খুবই যত্ন নেই ওদের তিনজনের। বাড়ির লোকের অভাব খুব একটা মনে হয় না।

এর মধ্যে প্রজেক্ট করতে, ল্যাবের রিপোর্ট লিখতে মাঝে মধ্যে হোস্টেলে যায় অভীক। ওর ইচ্ছা ছিল হোস্টেলেই থাকা – কিন্তু একটু দেরিতে এপ্লিকেশনটা জমা দেবার জন্য ও আর হোস্টেল পায়নি। সুমনের রুমে থাকে সুমন আর বিপ্লব – ওখানেই যায় অভীক মাঝে মধ্যেই। আড্ডা মারতে মারতে রিপোর্ট লেখে – মাঝে আবার এক দুই দিন ওই ঘরেই হালকা করে ঘুমিয়ে নিয়েছিল প্রচন্ড গরমের দিনে।

এক বৃষ্টির দিনে হোস্টেলে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরবে অভীক। বেরোনোর আগে ছেলেদের টয়লেটে হালকা বাথরুম করে নেবে বলে অভীক আর বিপ্লব একসঙ্গে ঢুকেছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাজ সারতে সারতে অভীক হটাৎ লক্ষ করলো ছেলেদের উরিনালের উপর একটা সোজা লাইন কেউ কেটে দিয়েছে পুরো জায়গাটা জুড়ে – প্রায় বুকের লেভেলে লাইন। সেটা নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বিপ্লব বললো – “একদম শেষে কি লেখা আছে দেখ ?”

কালো মোটা কলম দিয়ে কেউ লিখে দিয়েছে “এর ওপরে যে করতে পারবে, তাকে ৫০০ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে”

অভিনবত্ব দেখে খুব হাসি পেয়ে গেল অভিকের। ওপরে এখন অব্দি নাকি কেউ করতে পারেনি। যদিও অভিকের কোন ইন্টারেস্ট নেই এই কম্পেটিশনে নাম দিতে। হাসতে হাসতে বেরিয়ে বাড়ি চলে গেল সেইদিন।

তারপর তিন সপ্তাহ পরে হঠাৎ মাথায় বাজ পড়লো অভিকের। প্রফেসর পাল আগামীকাল হঠাৎ মেশিন ডিসাইন এর প্রজেক্ট জমা দিতে বলেছেন – অথচ কিছুই প্রায় তৈরী হয়নি। অগত্যা আবার সেই হোস্টেলে বসতে হবে বিপ্লব আর সুমনের সঙ্গে – আজ বোধয় সারা রাত জেগে কাজটা শেষ করতে হবে। সেদিন আর বিশেষ ক্লাস করে উঠতে পারেনি – দুপুর দুপুর হোস্টেলে ঢুকে পড়ল ওরা তিনজন।

রাত প্রায় ৩ টা – ক্লান্তিতে চোখ জুড়িয়ে এসেছে – কিন্তু ঘুমোনোর যো নেই – এখনো অনেকটা কাজ বাকি। তবে একটা ব্রেক দরকার – ঘর থেকে বেরিয়ে, বাইরে ঝিলের ধারে ঘুরতে ঘুরতে গল্প করছে আর সিগারেটের কাউন্টার খাচ্ছে বন্ধুরা মিলে। ফিরে আবার কাজে লাগতে হবে। কিছক্ষন পায়চারিতে ঘুমটা কেটে গেছে – চোখে মুখে একটু জল দিয়ে আবার কাজ শুরু করবে।

অভীক এর মধ্যে ছোট বাথরুম করতে করতে দেখে আগের লাইন টার নিচে একই রকম আর একটা লাইন কেউ কেটে রেখেছে। ওপরের লাইন এর শেষে ওই লেখাটা এখনো দেখা যাচ্ছে “এর ওপরে যে করতে পারবে, তাকে ৫০০ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে”।

একটু অবাক হয়ে ঘরে ঢুকে অভীক জিজ্ঞেস করলো – “উড়িনাল এর উপর আর একটা লাইন আজ দেখছি – সেটা আবার কেন? তোদের চোখে পড়েছে?”

সুমন – “ওটা আমারই কীর্তি – দিন চারেক আগে করেছি”

অভীক – “কেন শুনি ?”

সুমন – “কেন ? ওর পাশে লেখাটা দেখিস নি?”

অভীক – “না, ওর পাশে কোন লেখা নেই। শুধু ওপরের লাইনের পাশে আগের লেখাটাই আছে”

সুমন – “ওহ হো ! ভুলে গেছি তাহলে … তোরা কাজটা এগা – আমি একটু লিখে আসছি”

সেইদিন সকাল সাতটার সময় বাথরুমে গিয়ে দেখে ওপরের লাইন টা একই আছে লেখা সমেত “এর ওপরে যে করতে পারবে, তাকে ৫০০ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে”। তার নিচের লাইনের শেষে সুমন কালো পেন দিয়ে লিখে এসেছে –

“এই লাইন টা এস সি এস টি দের জন্য”

প্রজেক্ট রিপোর্ট জমা দেয়ার ক্লান্তিটা এক মুহূর্তে চলে গেল অভিকের – ভাবলো এই রকম সঠিক জবাব এতদিন কেউ দিতে পারেনি !!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.