Viva Voce

আবার সেই ইঞ্জিনীরিং পড়ার সময়কার গল্প। পড়াশোনা বাদে সবই করা হচ্ছে ঠিক ঠাক – না, এটা সত্যি কথাটা বলা হল না। ডিপার্টমেন্টাল সাবজেক্ট গুলো তাও পড়াশোনা করতাম – কারণ চার বছর বাদে ডিগ্রীটার মূল্য বোঝা যাবে চাকরির বাজারে। সেই সময় যদি ট্রান্সফরমার এর থ্রী ফেইস না বলতে পারি, তাহলে তো চাকরিটা হবেই না, তার উপরে বাবা ত্যাজ্য পুত্র ঘোষণা করতে বেশিক্ষন নেবেও না।

তবে আমাদের যত রাগ গিয়ে পড়তো নন-ডিপার্টমেন্টাল সাবজেক্ট এর উপরে। কেন এই অত্যাচার আমাদের দিনের পর দিন সহ্য করতে হবে শুনি? আমার ওমস ল জানলেই হবে – তার উপরে থের্মোডাইনামিক্স পরে, সনট্যাগ বই গুলে কেন খেতে হবে ?? সত্যি এটা মহা অন্যায়। আজকের দিন হলে নাহয় কেউ একটা পাবলিক লিটিগেশন ঠুকে দিত হাইকোর্টে – কিন্তু ২৬-২৭ বছর আগে এই চলটা এত ছিল না। তাই নেহাতই নিরুপায় হয়ে ক্লাসে যাওয়াটাই আমরা কমিয়ে নিতে লাগলাম – নেশাগ্রস্ত লোকেদের যেমন নেশা থেকে ছুটকারা দিতে অন্য দিকে মনটাকে নিয়ে যেত, সেই রকম সত্যেনদার ক্যান্টিন আমাদের এই সব অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি দেবার জন্য টেনে বার করে আনতো ক্লাস থেকে।

কিন্তু ওই নন-ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষায় তো পাশ করতে হবে ! তার জন্য ক্লাসটেস্টই ভরসা ছিল – ভালো নম্বর কোনোভাবে পেয়ে গেলে নিশ্চিন্ত। তার জন্য যা করণীয়, সেটা করতে হবে। কারুর বা বন্ধুপ্রীতি বেড়ে যেত ওই সময়, কেউ বা পরীক্ষার আগে রাত জেগে হারমোনিয়াম তৈরি করতে ব্যস্ত থাকতো, কেউ বা বাথরুমের পায়খানার সিস্টার্ন’এ প্লাষ্টিক জড়িয়ে বই পত্তর রেখে আস্ত। বন্ধুপ্রীতি আবার অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে থাকে, সেটা আগের একটা গল্পে বলেছিলাম। গৌরবের ওই কষ্টের কথা পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন।

যাই হক – বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষাতে পাশ করার জন্য বুদ্ধি লাগিয়ে বেরিয়ে যেত। কিন্তু ভয়ের বিষয় ছিল ভাইভাতে পাশ করা – কারণ মাস্টারমশাইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে – সেই সময় মাস্টার মশায় একটুও দয়া দেখান না – নিষ্ঠূর সাইলক এর মতন ছাত্রের মাংসপিন্ড গেলার জন্য উদগ্ৰীব হয়ে থাকতেন ওনারা। এর চেয়ে ডেঙ্গুর মশারা ভালো – ঘুমের মধ্যে কুটুস করে কামড়ে পালাবে, আপনি টেরও পাবেন না; কিন্তু এই ভাইভাতে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে মাস্টারমশাইরা আবার জিজ্ঞেস করতেন “কিছুই তো পারছো না – একদম ভুষি মাল” এবং মৃদু মৃদু হাসতেন। উফফফফফ ! এখনো ভাবলে গায়ে শিহরণ জাগে!

তা সেইবার থার্মোডাইনামিক্স এর ভাইভা – আমার ডাক পড়েছে ভাইভার জন্য। সনট্যাগ তো পড়িনি – তার জন্য জীবন ত্যাগ না করতে হয়। ঘরে ঢুকেই গা হিম হয়ে গেল – দেখি প্রফেসর হাসি হাসি মুখ করে বসতে বললেন। হাসি মুখ মানেই ততোধিক কঠিন প্রশ্ন আসছে। মনে হল যেন উনি মনে মনে গাইছেন “খাবো তোকে ! ঘচাং ফু!”

প্রফেসর: “মনে করো তুমি ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছ। দিনের বেলাতে যাচ্ছ এবং তাই গরম ক্রমশ বাড়তে লাগল। তা তুমি কি করবে তখন ?”

আমি: “স্যার, তখন হাতপাখা দিয়ে নিজেকে হাওয়া করব”

প্রফেসর” “উফফ ! ধরো তোমার কাছে, বা আসে পাশে কারুরই হাতপাখা নেই, এবং একটা মাত্র জানালায় বন্ধ। এই অবস্থায় কি করবে ?”

আমি: “স্যার, তখন জানালাটাকে খুলে দেব – যাতে হাওয়া ঢোকে ভিতরে”

ব্যাস !! একদম ফাঁদে পরে গেলাম – কেন যে জানালা খুলতে গেলাম !!!

প্রফেসর: “বাঃ ! ধরো জানালাটার আয়তন হল ২ স্কোয়ার মিটার, কম্পার্টমেন্টের আয়তন হল গিয়ে ১৫ স্কোয়ার মিটার, বাইরের তাপমান ৩৩ ডিগ্রী, ভিতরের তাপমান ৩৬ ডিগ্রি, ট্রেন এগোচ্ছে ৯০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় উত্তরের দিকে, বাইরে দক্ষিণের দিকে হাওয়া দিচ্ছে ১৩ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় – প্রশ্নটা হল – কতক্ষনে কামরার তাপমান ৩৩ ডিগ্রী হবে ?”

আমি প্রশ্ন শুনে ভাবার নাম করে নিজের জুতোর কাদার ছোপগুলো দেখছি, আসে পাশে ফ্লোরের টালির রং দেখছি – এই ভাবে পাঁচ মিনিট নিস্তব্ধতার মধ্যে কাটিয়ে বললাম “জানি না স্যার !”

তার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম ঘামতে ঘামতে – “অকর্মণ্যের ধারী” – এই অব্দি শুনে মনে হল এইবার বেরিয়ে যাওয়াটাই ভালো।

বেরিয়েই দেখি গৌরব পায়চারি করছে – কারণ ওর রোলনাম্বার আমার পড়েই, তাই ওর এখুনি ডাক পড়বে। ছুটতে ছুটতে এসে কি প্রশ্ন করল জিজ্ঞাস করাতে আমি পুরোটাই বললাম।

এর পরে ও ঢুকেছে ভাইভা দিতে:

প্রফেসর শুরু করলেন : “মনে করো তুমি ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছ। দিনের বেলাতে যাচ্ছ এবং তাই গরম ক্রমশ বাড়তে লাগল। তা তুমি কি করবে তখন ?”

গৌরব: “স্যার, একটু ঘাম সহ্য করব”

প্রফেসর: “কতক্ষন করবে ? ধরো এক ঘন্টা হয়ে গেছে – কুল কুল করে ঘামছো। তখন কি করবে?”

গৌরব: “স্যার, জামা টা খুলে ফেলবো”

প্রফেসর: “তাতেও গরম যাচ্ছে না, তখন?”

গৌরব: “স্যার, নিচের স্যান্ডো গেঞ্জিটা খুলবো”

প্রফেসর (অধৈর্য হয়ে): “তারপর ? ধরো প্যান্ট মজা জুতো সব খুলে ফেলেছো? তাতেও গরম কমছে না – তখন?”

গৌরব: “স্যার – জাঙ্গিয়া টা এখনো আছে পড়া – ওটা কি?”

প্রফেসর (সিট থেকে লাফিয়ে উঠে): “দাড়াও দাড়াও ! ওটা নিয়ে কি করবে পরে বলো – তবে এটা জেনে রেখো যে একদম উলঙ্গ হলে ট্রেনের লোক প্রচন্ড মারবে তোমাকে – তখন কি করবে?”

গৌরব: “স্যার,মার্ খেতে হলে খাবো, জাঙ্গিয়া খুলতেই হবে। প্রাণ গেলেও স্যার, ওই জানালা আমি কিছুতেই খুলতে পারবো না বলে দিলাম!”

======================================================

তারপর ??

একজন শান্ত প্রফেসরও এতটা উত্তেজিত হতে নাকি যাদবপুরের ইতিহাসে দেখা যায়নি।

আর গৌরব সত্যেনদার ক্যান্টিন এ ঢুকে চা খেতে খেতে বললো “উলঙ্গ হয়েছি তো কি হয়েছে? জাঙ্গিয়া পর্যন্ত খুলতে হয়েছে তো কি হয়েছে? আমি কিন্তু জানালা খোলার ফাঁদে পা দিইনি !!!!”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: