Kitchen

কলকাতা তে শুভ আসে চাকরির সূত্রে। তাদের আদি বাড়ি জলপাইগুড়ি – কিন্তু দুর্গাপুরে পড়াশোনা করে কলকাতায় আসে সে প্রায় ১২ বছর আগে। প্রথম প্রথম শহরের ধাক্কাটা ভালো লাগেনি – সবাই খুব ব্যস্ত – কেউ ভালোভাবে কথা বলে না, এবং তার চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হলো গিয়ে যানজট। ঢাকুরিয়াতে বাড়ি ভাড়া করে থাকা – কিন্তু সেই সল্টলেকের সেক্টর ৫ এ যাতায়াত খুবই চাপের হয়ে উঠেছে আজকাল। ৩০ মিনিটের রাস্তা অফিস টাইমে লাগে প্রায় ১ থেকে ১.৩০ ঘন্টা। তার মধ্যে আছে দূষণশীল হাওয়া, ভ্যাপসা গরমের ঘাম আর অধের্য মানুষের খ্যাক খ্যাকানি। সব মিলিয়ে নাজেহাল একদম।

তাই সদ্য বিয়ের পর ঠিক করেছে অফিসের কাছে একটা ছোট ফ্লাট কিনে নিয়ে ওই খানে থাকবে। মাস দুয়েকের মধ্যে প্রচুর ঘোড়া ঘুড়ির পর একটা ফ্লাট ও পছন্দ হয়ে গেল নতুন নিউটউন রাজারহাটে। কমপ্লেক্সের মধ্যে একটা ফ্লাট – দুটি বেডরুম, একটা ছোট স্টাডি – আবার একটা ছোট বারান্দাও আছে বাগানের দিকে মুখ করে। বৌ অপর্ণা খুব মডার্ন – তাই তার খুঁতখুঁতানি এড়িয়েও যখন এই ফ্লাট টা পছন্দ হলো, তখন যাকে বলে মেঘ না চাইতে জল ! প্রত্যেক শনিবার টো টো করা ঘোরা থেকে এখন একটু মুক্তি – অবশেষে !!

প্রায় ৫০ লাখের ফ্ল্যাটের ব্যাঙ্ক লোনের কাগজে সই করতে গিয়ে শুভর হাতটা ভালো ভাবেই কেঁপে গেল। মাসে মাসে ব্যাঙ্ক কে যা দিতে হবে, সেই সংখ্যাটা দেখেই হাতটা কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু শুভ নিরুপায় – একে এই নিত্য যাতায়াত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল – তার মধ্যে প্রত্যেক শনিবার দিবানিদ্রা ত্যাগ করে ঘোরা আর দিনের শেষে অপর্ণার প্রত্যাখ্যান – এটাও আর সহ্য করা যাচ্ছিলো না। তাই সব মিলিয়ে শুভ ভাবল – এই বার নিশ্চিন্তি !!

ফ্ল্যাটের পসেশন ও এসে গেল ক্রমশ – এইবার শুধু গৃহপ্রবেশ আর মালপত্র নিয়ে ঢুকে পড়া ! কিন্তু কোথায় কি? প্রোমোটার-এর সদ্য লাগানো নতুন কলে নাকি “ফোম” জল পরে না; চকচকে দরজার হাতল নাকি সেকেলে; ইত্যাদি ইত্যাদি। যে কলে একবারও মুখ কুলকুচি করতে পারলো না, যে দরজার হাতল একবার ও বেকিয়ে ঘরে ঢোকা হলো না – সেই গুলো এখুনি পাল্টাতে হবে – অপর্ণার আদেশ ! তার মধ্যে লাইট ফিটিং, এসি, গেইসের – সবই কিনতে হবে। এমনকি পুরানো বাড়ির সোফা নাকি নতুন বাড়িতে মানানসই হচ্ছে না – সব শুনতে শুনতে শুভর মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছে কেন যে হটাৎ ফ্লাট কেনার হুজুক তুললো !!

তারপরে বাড়ি রঙের পালা – কোম্পানির লোক আসছে আর যাচ্ছে। একটা কালার শেড আজ পছন্দ হলো – সেটাই যে পরদিন কি করে অপছন্দ হয়ে যাচ্ছে, শুভর বিদ্যার বাইরে। প্রোমোটার চুনকাম করে ফ্ল্যাটটা দিয়েছিল – বেশ ফর্সা ফর্সা দেয়ালগুলো। সেই দেখে প্রথমে শুভ বলে ফেলেছিল – “দিব্বি দেয়ালগুলো দেখাচ্ছে কিন্তু ! এখন রং না করে বছর তিনেক পরে রং করলেই তো হয়”। এর ফল যে এতটা ভয়াবহ হবে কে জানতো – শুরু হলো যে ওর মতন অপদার্থ লোক কেউ দেখেনি – এবং শেষ হলো কেন যে তাকে বিয়ে করতে গিয়েছিলো অপর্ণা ! এত বড় ভুল নাকি ইতিহাসে হয়নি আগে !

তারপর থেকে শুভ নির্বাক শ্রোতা – তার কাজ শুধু বৌয়ের মতামতে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলা। নতুন ফ্ল্যাটে লাগতে শুরু হলো নতুন জাগুয়ারের ফোয়ারা যুক্ত কল, পর্দার রড, বাহারি দরজার হাতল, ইত্যাদি। শুভ শুধু ক্রেডিট কার্ড মেশিন এ লাগায় – আর আড়চোখে বিলের ভ্যালুটা দেখে ঢোক গেলে! মিটার তো চড়চড় করে বেড়েই যাচ্ছে – যখন ৪ লক্ষ অতিক্রমণ করেছে, তখন অপর্ণা বললো যে মডুলার কিচেন বানাতেই হবে !

কিচেন যে আবার মডুলার হয় – সেটা শুভ প্রথমবার শুনলো। অফিসের বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো যে ১.৫ থেকে ২ লক্ষ টাকা খরচ হবেই হবে! দাম শুনেই বুকটা ধড়াস করে উঠলো – এটা কিছুতেই করতে দেয়া হবে না। করতে দিলে এইবার বাটি নিয়ে রাস্তায় জাঙ্গিয়া পরে বসতে হবে! অথচ জোর গলাতে “না” বললে এমনিতেই প্রাণটা চলে যাবে।

এর দুদিন পর শুক্রবার সন্ধ্যেবেলাতে শুভ অপর্ণাকে বললো “চলো, আজকে ভালো খাওয়াদাওয়া করি? ম্যারিয়ট এ ভালো বুফে চালু হয়েছে – যাবে নাকি?”

অপর্ণার সন্দেহ হল – যে কিনা গত একমাসে বাইরে খেতে যায়নি, সে বলছে একদম ম্যারিওট? তবুও বাইরে খেতে ও ভালো বাসে – তাই রাজি হয়ে গেল যেতে।

এলাহী খাবার খেতে খেতে শুভ আলোচনা শুরু করে দিল:

শুভ: “আচ্ছা, তোমাকে আমি লাইফ এ ম্যাক্সিমাম কত টাকার গিফট দিয়েছি?”

অপর্ণা: “মানে ??”

শুভ: “আরে এমনি জিজ্ঞেস করছি – বলো না কত টাকার জিনিস দিয়েছি?”

অপর্ণা: “তোমার মতলবটা কি বলো তো ?”

শুভ: “উফফ ! এমনি জিজ্ঞেস করছি সরল মনে”

অপর্ণা ভেবে বললো: “বিয়ের পর একটা শাড়ি দিয়েছিলে – সেটার দাম ছিল মনে হয় ৫ হাজার টাকা। না না, মনে পড়েছে – প্রথম এনিভার্সারি তে একটা নেকলেস দিয়েছিলে – যতদূর মনে পরে সেটার দাম ছিল ১০ – ১২ হাজার”

শুভ: “ভেবে নিয়ে বলো”

অপর্ণা: “হ্যাঁ হ্যাঁ – ভেবেই বললাম। তা এইবার বলো তা কেন এটা জিজ্ঞেস করছো ?”

শুভ: “পরে উত্তর দিচ্ছি … তবে এটা বলো তো তুমি কি চাও কাজের মাসিকে তোমার চেয়েও দামি গিফট দি? ধরো ২ লক্ষ টাকার গিফট – তোমার ভালো লাগবে তাতে ?”

অপর্ণা বেশ অবাক হয়ে গেল: “কি বলছো তুমি ?”

শুভ প্রশ্নটা আর একবার জিজ্ঞেস করাতেই অপর্ণা রেগে গিয়ে বললো: “মোটেই না ! কাজের মাসিকে ওতো কি দেবার আছে?”

শুভ: “তাহলে কেন মডুলার কিচেন টা চাইছো শুনি? ওটা হলে তো কাজের মাসিই বেশি ব্যবহার করবে – তা সেটার খরচ প্রায় ২ লক্ষ টাকা .. ঠিক আছে – তোমার যখন মডুলার কিচেনের এতই শখ – কাজের মাসির জন্য ওটা অর্ডার দিয়েই দি – কি বলো?”

…………

এর পরে অপর্ণার আর মডুলার কিচেনটা করানো হয়নি – তবে তার বদলে কথা আদায় করে নিয়েছে যে বছর দুয়েক পর ওই কিচেন ও বানাবেই …. এবং তাতে শুভ হাসি মুখেই রাজি হয়ে গেছে

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: