Gopal

সবে চাকরিতে তখন ঢুকেছি। কলেজের দরজা থেকে চাকরির দুনিয়াতে লাফ দেওয়াটা একটা বিরাট ব্যাপার সবার জন্য। সুবিধার চেয়ে প্রথম প্রথম অসুবিধার সংখ্যাটা বেশি চোখে লাগতো। কলেজের স্বাধীনতা নেই – বরঞ্চ একটা গন্ডির মধ্যে সব সময় থাকা – এইটা বেশ ধাক্কা লাগে আগে। কলেজে প্রথম ক্লাস শুরু হতো ১০.২০ তে – তাও সেটা আবার বেশির ভাগ করতাম না। তাই ১০.৩০ নাগাদ কলেজে পৌঁছেই অ্যাটেনডেন্স দিতে চলে যেতাম ক্যান্টিনে – তার পরিবর্তে ঠিক কাঁটায় কাঁটায় সকাল ৯ টার মধ্যে ঢুকতে হবে ফ্যাক্টরির মধ্যে। প্রচুর চাপের ব্যাপার – তার মধ্যে যখন ফ্যাক্টরি হলো মাজেরহাট ব্রিজের ওখানে আর আমাকে আস্তে হতো সেই সল্টলেক থেকে! এ তো শুধু চাপ নয়, একদম ভীষণ চাপ !!

কোনোমতে ঘুম থেকে উঠে, স্নান করে, দুটি মুখে দিয়ে পাবলিক বাস ধরতে হতো সকাল ৭.৩০ র সময়। বাড়ির ওখান থেকে সেই সময় ৪৬এ বলে একটা বাস যেত ওই সময়ে – সেটা ধরে পৌঁছতাম ধর্মতলাতে। তারপর ওখান থেকে আর একটা বাস ধরে মাজেরহাট ব্রিজ – এর পরে ১৫ মিনিটের হাঁটা পথ।

তবে মানুষ অভ্যাসের দাস – বেশ একটা রুটিন সেট হয়ে গেলো কিছুদিনের মধ্যে। ৭.৩০ টার বাসে উঠেই আগে টিকেট কেটে নিতাম। অত সকালের বাসে বসার জায়গা পেতে অসুবিধা হতো না – বসেই একটা লম্বা ঘুম যতক্ষণ না কন্ডাকটর এসে ডেকে বলতো “ভাই, বাস তো আর যাবে না – ধর্মতলা এসে গেছে! এখন দয়া করে উঠে পর!”

আমি যেখান থেকে উঠতাম, তার চার / পাঁচটা স্টপের পর থেকে সুশান্ত উঠতো – সে আমার সঙ্গে একই রুটে যেত তাড়াতলার মোড় অব্দি। প্রায় সমবয়েসি ছিলাম – তাই বন্ধুত্ব তাড়াতাড়ি হয়ে গিয়েছিলো। তবে বাসে খুব একটা কথা হত না – কারণ বাসে উঠেই দুজনে মুখ হাঁ করে ঘুমোতাম পাশাপাশি বসে – কথা বলার টাইম কই? বাসের কন্ডাকটর থেকে সবার সঙ্গে চেনাশোনা হয়ে গিয়েছিলো – কারণ আমরা ছিলাম যাকে বলে ডেইলি প্যাসেঞ্জার।

বাসটার অবস্থ্যা ছিল মারাত্মক – সিটগুলো ছিড়ে গিয়ে ছোবড়া বেরিয়ে এসেছে একদিকে। অন্যদিকে বাসের জানালা বন্ধ করা যায় না – সেই জন্য বর্ষাকালে ছাতা খুলে বসতে হত। আর বাসের ইঞ্জিন ছিল ৯০ বছরের বৃদ্ধের মতন – সারাক্ষন ঘো ঘো আওয়াজ করতো – মাঝে মধ্যে মনে হত যেন ভীষণ নিঃশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে; তার মধ্যে ব্রেক মারলে মনে হত যেন হাপ্ টানের কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে। সবাই আমাদেরকে দেখে বলতো যে এই আওয়াজের মধ্যেও কি ভাবে আমরা ঘুমাতে পারি ?

আমরা সাইড এর সিটে বসতাম – যেখানে বসতাম তার উপরে এডভার্টাইসমেন্টের পোস্টার মেরে গিয়েছিলো গোপালের গেঞ্জি ও জাঙ্গিয়ার। সেটাও হয়তো ৫ বছর আগে মারা – লেখার উপর একটা মোটা ধুলোর লেয়ার পরে গিয়ে লেখা টা প্রায় উঠে গেছে। তবুও সেই গোপালের গেঞ্জির নিচে আমি বসতাম, আর সুশান্ত জাঙ্গিয়ার নিচে। বসা বলাটা ভুল হবে, ঘুমোতাম বেশি।

এক বর্ষার দিনে আমরা যাচ্ছি মুখ হাঁ করে – মানে ঘুমোতে ঘুমোতে। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে লাগছিলো – তাই মাঝে মধ্যে ঘুম ভেঙে গিয়ে বাসের মালিক কে বাপ্-বাপান্ত করে আবার মুখ হাঁ করাতে ব্যস্ত হচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ খুলে দেখি মেট্রো সিনেমা এসে গেছে – নামার সময় হয়ে এসেছে। সুশান্ত কে ডেকে নিয়ে নামার উপক্রম করলাম।

বাস থেকে আমি নেমে গেছি – সুশান্ত নামতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলো ছাতাটা সিট এর উপর ভুলে আসছিল – সেটা আনতে গিয়ে দেখি হাঁ করে সিট এর উপরের দিকে তাকিয়ে স্থীর হয়ে আছে।

অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে বিরক্ত হয়ে বললাম “কি হলো ?? নামবি না ??”

সুশান্ত: “না রেঃ ! বেশ চিন্তায় পরে গেলাম!”

আমি: “কেন? কি হয়েছে বলবি তো? দেরি করিস না – এটেন্ডেন্স কাটা পরে যাবে”

সুশান্ত: “আজ কাটা পড়লে পড়ুক – কিন্তু এর চিন্তা আমি কি করে দূর করবো বল?”

ততক্ষণে আমি বাসে উঠে গিয়েছি এবং সুশান্ত কি দেখছে এত মন দিয়ে – সেটা দেখতে ঘাড়টা ঘুরিয়েছি উপরের দিকে। উঁচু করে লেখাটা দেখেই আমি হো হো করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লাম!

দেখি গোপালের এডভার্টাইসমেন্ট যেখানে লেখা থাকতো “গোপালের গেঞ্জি ও জাঙ্গিয়া পড়ূন”, সেখানে নিচে মোটা কালো পেন দিয়ে কেউ একজন লিখে দিয়েছে “তাহলে গোপাল কি পড়িবে ?”

পঁচিশ বছর পরেও আজও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেরাচ্ছি ……..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: