Hublot

বিশ্বকাপ চলছে। কলকাতার চারিদিকে তুমুল উত্তেজনা। এমনিতেই সবাই জানে এই সময় শহরটা ইস্ট বেঙ্গল – মোহন বাগান ভুলে গিয়ে তখন ব্রাজিল – আর্জেন্টিনা তে বিভক্ত হয়ে যায়। লোকে তখন নিজের টিমের খবর না রেখে অন্যদের খবর বেশি রাখে – কারণ সেই বুঝে স্ট্রাটেজি করে তর্কাতর্কি করতে হবে। নেইমার গোল পায়নি ? তাহলে মেসি একটা দুটো মিস করলে কার কি অসুবিধা? আর্জেন্টিনা হেরে গেছে ফ্রান্সের কাছে ? বাব্বা ! কি নিশ্চিন্ত ভাবে এইবার ব্রাজিলের খেলা দেখা যেতে পারে – এই রাউন্ডে ব্রাজিল হেরে গেলে দুঃখ তো লাগবে, কিন্তু তর্কের ময়দানে বলতে তো পারবো যে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার চেয়ে একটা বেশি রাউন্ড অব্দি গেছে ! এতেই কি আনন্দ – যেন বগলে বিশ্বকাপ নিয়েই ঘুরছে পাড়ার ছেলে।

এই বিশবকাপ এর জন্য বাড়ির সকলেই একটু আধটু খেলা দেখতে বাধ্য হয় – সে ফুটবল না জানলেও, না ভালোবাসলেও। কারণ টিভির রিমোট তো হাতছাড়া – তাই বকুলকথা নিয়ে ঝগড়া হতে পারে – কিন্তু সেই ঝগড়াটা শেষ অব্দি হারেই পরিণত হয়, কারণ সেই সময় যদি এম্ব্যাপে বল নিয়ে ছোটে, তাহলে আর কি করা যাবে !! তাই নেহাতই বাধ্য হয়ে বাড়ির মহিলারা খেলা দেখতে বসে এবং সেই সঙ্গে খেলা সম্বন্ধে প্রচুর প্রশ্ন করে নিজেদের জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা করে – অফসাইড কি? হঠাৎ একজন মাঠের পাশে ছোটাছুটি করা ভদ্রলোক পতাকা দেখাচ্ছে কেন ? ইত্যাদি, ইত্যাদি

তা আমি বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে এক সঙ্গে দেখতে বসেছি বেলজিয়াম আর ব্রাজিলের কোয়ার্টারফাইনাল এর ম্যাচ। মেসির আর্জেন্টিনা বিদায় নিয়েছে – তাই নেইমারের ব্রাজিল কোন সাহসে আরো এক ধাপ এগিয়েছে? এই অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ করার জন্যই খেলা দেখতে বসা – এবং এক গুচ্ছ ব্রাজিলের সমর্থকের মধ্যে মধ্যমনি হয়ে বেলজিয়াম কে সাপোর্ট করছি তারস্বরে। বাড়ি থেকে বেড়োনোর সময় বৌকে LIC এর কাগজপত্র বুঝিয়ে এসেছি – যদি বাড়ি না ফিরি এই রকম পরিবেশ থেকে ।

যায় হোক – হাফ টাইম হয়ে গেছে। আমি প্রায় বন্ধুদের কোলের উপর দাঁড়িয়ে নাচানাচি করছি – ২ গোল এ এগিয়ে বেলজিয়াম। বেলজিয়াম চকলেট ছাড়া বেলজিয়াম এর উপর কোনোদিনই আমার টান ছিল না – আজ যেন ভালোবাসার জোয়ারে নিজেই অধ্যেক বেলজিয়ান হয়ে গেছি। বাকি ৫ বন্ধু সর্বক্ষণ আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে শাসাচ্ছে “এটা কিন্তু ভালো করছিস না – নেইমার এর পায়ে বল পেলেই খালি বলছিস – এই বার ব্রাজিল নিশ্চয় গোল দেবে! তোর জন্যই ব্রাজিল গোল দিতে পারছে না !! আর একবার যদি করিস – তাহলে কিন্তু হাত চালিয়ে দেব”

কাঁচা গালাগালি দিতে পারছে না – কারণ মাসিমাও খেলা দেখতে বসেছেন এবং মাঝে মধ্যে ফোড়ন কাটছেন “দুর ! বাজে খেলা – এতক্ষন এ শুধু দুটো গোল হয়েছে! বিরাট কোহলি থাকলে দেখতি কটা ছয় মেরে দিতো এই ৪৫ মিনিটে”

নেহাত মাসিমা বলে কথা – তাই সহ্য করতে হচ্ছে, তার মধ্যে উনি আবার একটু আগে আলুর চপ ভেজে দিয়েছেন – তাই শান্ত ভাবে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি যে এটা ক্রিকেট নয় ! সজল খেপে উঠছে “মা! তুমি দয়া করে চুপ করে খেলা দেখবে? একে ব্রাজিল হারছে, তার মধ্যে এই সব কমেন্ট করে চলেছো??” বন্ধুপত্নী শিঞ্জিনী ও মা কে একটু শান্ত করার চেষ্টা করে চলেছে।

এরই মাঝে ব্রাজিল এক গোল শোধ দিয়ে দিয়েছে। খেলা তখন প্রায় ১৫ – ২০ মিনিট বাকি। চরম উত্তেজনা ঘরের মধ্যে – বিভিন্ন ঠাকুরের প্রতি আহ্বান চলছে একটু দয়ার জন্য। ব্রাজিল তখন একদম চেপে ধরেছে – এক একটা আক্রমণ করছে আর আমার হৃৎপিণ্ড প্রায় হাতের মধ্যে। পাশ থেকে চাপা গলায় গালি দিচ্ছে সজল ব্রাজিল এর নেইমারকে – বেচারা গোলে শট টা রাখতে পারেনি। খেলা ৮৭ মিনিটের দিকে এগিয়ে গেছে।

অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারী বোর্ড নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন – প্লেয়ার পরিবর্তন হবে বেলজিয়ামের ! ঘরে টেনশনের একটা ঘন মেঘ।

সেই সময় মাসিমা বলে উঠলেন “হুব্লোট এখনো নামছে না কেন?”

সজল : “মানে ?”

মাসিমা: “তুই তো আগের দিন বললি যে বোর্ড দেখলে প্লেয়ার পাল্টায়?”

সজল: “তা তো হয় ঠিকই ! কিন্তু হুব্লোট টা আবার কোন প্লেয়ার?”

মাসিমা উত্তেজিত হয়ে : “অনেকদিন ধরে বলছি চোখটা দেখা – সারাক্ষন তো পিট্ পিট্ করে খেলা দেখছিস! দেখ না বাবা – বোর্ডের গায়ে নাম লেখা আছে হুব্লোট? তোমরাই বলো না – আমি কি ভুল কিছু বলছি?”

gettyimages-976125386-1024x1024

আমরা ঠিক কি বলবো বুঝে উঠতে পারলাম না। হঠাৎ পাশে বসা মলয় হো হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়লো। আমরাও আর গম্ভীর থাকতে পারলাম না – সবার হাসির আওয়াজে ঘরটা গম গম করতে লাগলো!

সজল তখন হাসতে হাসতে বললো “মা – হুব্লোট হচ্ছে স্পনসর – তাই ওর নামটা ওখানে লেখা আছে যাতে লোক তার এডভার্টাইসমেন্ট টা দেখতে পায়। যে মাঠে নামছে – তার নম্বর বোর্ড এ দেখাচ্ছে”

মাসিমা লজ্জিত ভাবে বলে উঠলেন “আমি অত কি বুঝি? যাই তোদের জন্য চা নিয়ে আসি ….”

ব্রাজিল সেদিন হারা সত্ত্বেও বন্ধুরা আমাকে পেটায়নি – আমিও বাড়ি ফেরার আগে মাসিমা কে বলে এলাম – “ভাগ্যিস আজ আপনি ছিলেন – নইলে আমাকে তো হাসপাতালে যেতে হতো”

এই হুব্লোটকে আমি তাই চট করে ভুলতে পারবো না :-)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: