পেট্রল পাম্প

এই পূজার পর আমার এক নিকট আত্মীয়র সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। মিষ্টি মুখের বদলে একটু নোনতা মুখ করতে করতে এমনি কথা বার্তা হচ্ছিল। কথা হতে হতে ছোটবেলার কথা উঠে এল। মনে রাখবেন যে মাথার চুলে যদি পাঁক ধরাটা দেখতে আর আশ্চর্য না লাগে, তখন পুরনো দিনের কারুর সঙ্গে দেখা হলে বেশির ভাগ সময় ছোটবেলার কথাই বেশি হয় – তাই অযথা “বুড়ো ! বুড়ো !” বলে লাফাবার কিছু নেই !!!!

তা ওর কথাগুলো ওর মুখেই শুনুন না:

“বুঝলি তো – এখনো পূজার রেশটা কাটেনি – ভালোই পূজার হ্যাংওভার আছে। তাই পূজার গল্পের কথাই শুধু মনে আসছে। তখন আমি বেশ ছোট – হাফ প্যান্ট পড়ি আর ভাবি কবে অন্যদের মতন ফুল প্যান্ট পরে নিজের বড় হওয়াটাকে সবার সামনে জাহির করতে পারব। সেই সময় আমরা সব এক সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম। আমরা বলতে মাসতুতো ভাই বোনেরা, মা, মাসিরা, মেসো আর দিদাও আসতেন আমাদের সঙ্গে। সেই আশি দশকের গোড়ার দিকে। মেসো গাড়ি চালাতো – আমরা ভাই বোনেরা সামনে বসতাম – পেছনে দিদা তার তিন মেয়ে নিয়ে বসতেন।

কিরে ? অত অবাক হয়ে কি তাকিয়ে আছিস? তখনকার দিনে জানিস তো অ্যাম্বাসেডর গাড়ি বলে একটা জিনিস ছিল – সেটাতে ছোট খাটো হাতি ও ঢুকতে পারতো – তা আমরা তো “ছোট সুখী” পরিবারের মধ্যেই পড়ি। আর আজকের দিনের মতন অত ভিড় হতো না ঠাকুর দেখার জন্য। ষষ্ঠীর সন্ধ্যেতে সবার অফিস হবার পর আমরা মাসির বাড়ি যেতাম – খেয়ে নিয়ে রাত দশটা নাগাদ রওনা হতাম – সেই ভোর চারটে অব্দি কলকাতা শহরে ঘোরা আর ঠাকুর দেখা।

আমরা যাতে না ঘুমিয়ে পড়ি, তার জন্য মেসো টার্গেট দিয়ে দিতো শুরুতেই – সব মিলিয়ে ১০০ টা ঠাকুর না দেখলে আমরা বাড়ি ফিরতে পারব না। আমরা তখন কচি কাচার দলে পড়ি – প্রথম থেকেই চিৎকার করে গুনতে শুরু করে দিতাম – “এক, দুই, তিন, চার …..”। আমাদের চেয়ে পাশের গাড়ির লোকেরা আগেই বুঝে যেত কটা ঠাকুর দেখা হয়েছে। মাঝে মধ্যে একটু থেমে মা’এরা চা কফি খেত – আর আমাদের জন্য ছিল আইসক্রিম। তখন ছিল কোয়ালিটি’র যুগ – আজকালকার ওয়ালস কোথাও আসেনি।

এই ভাবে যেতে যেতে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়তো। কিন্তু তখন হয়তো গুনতিতে সবে ৮৫, ৮৬ চলছে। একশো করতেই হবে – নইলে বাড়ি ফেরাই যাবে না। সবাই পা ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে ৯৬ অব্দি টানা হয়েছে – আর শরীরে দিচ্ছে না। আমরা প্রায় ঘুমে ঢোলে পড়ছি – গাড়ির পেছন থেকে শুধু হাই তোলার শব্দ – দিদা তো তখনি চোখ খুলেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছেন।

তখন আর গাড়ি থেকে নেমে ঠাকুর দেখাই হচ্ছে না – কোনোরকম এ একটু মুখ বাড়িয়ে গণেশ ঠাকুরের ভুঁড়িটা দেখতে পেলেই চেঁচিয়ে ওঠা হচ্ছে “৯৭” ! সেই সময় অত ভিড় হতো না বলে প্রায় প্যান্ডেল অব্দি গাড়ি নিয়ে যাওয়া যেত – তাই হাঁটা হাঁটি বেশি না করলেও চলতো।

তা সেবার ৯৮ অব্দি হয়েছে। বাইরে ভোরের আলো উঠতে আরম্ভ করেছে – কাক ডাকাও শুরু হয়ে গেছে। সবাই কাকুতি মিনতি করছে যে এই বার ১০০ না হলেও চলবে। কিন্তু মেসো নাছোড়বান্দা – গাড়ি থেকে দেখলেও দেখতে হবে ১০০ টা। সেই সময় হটাৎ কেউ একটা বলে ফেললো “ওই তো সামনে আলো দেখা যাচ্ছে – নিশ্চই আর একটা পূজা”।

মেসো গাড়ি চালাতে শুরু করে ওই দিকে যেতে লাগলো। আলোটা ক্রমশ তেজ হতে লাগলো। সবাই উদগ্রীব হয়ে বসে আছে – আর দুটো দেখলেই বাড়ি ফিরতে পারবে। ঠিক সেই সময় দিদা আধঘুম অবস্থায় নমস্কার করে বলতে লাগলেন “মা, মা গো ! প্রণাম নিও মা ! সবাইকে রক্ষা করো মা !” গাড়ি এগোচ্ছে আলোর দিকে আর দিদার প্রার্থনা জোর থেকে আরও জোরে হতে লাগলো।

মেসো হঠাৎ বলে উঠলেন “আরে ! ওটা তো একটা পেট্রল পাম্প’এর আলো – দূর্গাপূজা ওখানে হচ্ছে না”। সেইবার ৯৮ দেখেই বাড়ি ফেরা হলো হাসির আলোড়নের মধ্যে দিয়ে।

তারপর থেকেই পেট্রল পাম্প দেখলেই কেন জানি মা দুর্গার কথা খুব মনে হয় !!”

 

  1. Partha Chakraborty October 29, 2018 at 10:53 pm

    Very nice Ayan! Partha

    Reply

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: