বিজয়ার ভালোবাসা জানানোর আগে চিন্তা করে নেবেন প্লিজ …

মনটা ভারাক্রান্ত। হওয়াটাই স্বাভাবিক। সবে মাত্র মা দূর্গা রওনা হয়েছেন শশুড়বাড়ির দিকে এবং তার সঙ্গে এই বছরের দূর্গা পূজা শেষ। তবে আর মাত্র ৩৫০ দিনের অপেক্ষা পরের পূজার জন্য। বাঙালি তার প্রথা অনুযায়ী বিজয়ার আদান প্রদানে এখন ব্যস্ত আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। চলছে কোলাকুলি, চলছে মিষ্টি মুখ – তারই মধ্যে বৌয়েরা কটমট করে তাকিয়ে থাকছে তাদের সুগার’এর রুগী এবং লোভী বরেদের দিকে। এতো করে ট্রেনিং দেওয়া হলো মিষ্টির একটা কোনা ভেঙে খাওয়া – তা ভুলে কপাৎ করে আস্ত রসগোল্লাটা মুখে ভরে দিলো, তাও আবার রস সমেত ?? আজ বাড়ি ফিরেই হবে তার হিসেবে নিকেশ !

ছোটবেলা থেকেই বাড়ি বাড়ি যেতাম মিষ্টি খাবার লোভে – শুধু একটা প্রণাম এবং তারপরে আড় চোখে তাকিয়ে থাকা দরজার পর্দাটা কখন নড়বে এবং মাসিমা ট্রেতে করে মিষ্টি নিয়ে আসবেন। এখন অনেক মাসিমাই আর এই পৃথিবীতে নেই; আমাদের মাথাতেও চুলের রঙের দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে – তবুও স্বভাব তো চট করে পাল্টায় না। তাই বন্ধুরা মিলে বেড়িয়েছি আর এক বন্ধুর বাড়িতে।

খাটনির মধ্যে আছে একটা কোলাকুলি – তার বদলে সুগারফ্রী দিয়ে এক কাপ চা, একটু নোনতা আর তারপরে দুই তিনটি মিষ্টি। সেইরকম ভাবেই পৌঁছুলাম সুমনের বাড়িতে। কিন্তু তারপরেই যে প্রায় মার খেতে খেতে পালাতে হবে, সেটা থোড়াই আগে জানতাম !

শুরুটা ঠিকঠাকই ছিল। সুমন বাড়িতেও ছিল – কোলাকুলি পর্ব শেষ হয়ে গেল তাড়াতাড়ি। এর পরে প্রায় আড্ডা চললো আধ ঘন্টা ধরে। প্রায় ছয় মাস পরে দেখা – তাই আলোচনার বিষয়েরও কমতি ছিল না। আড্ডার সাথে সাথে প্রচুর খাওয়া দাওয়া – মাটন রোল, চিকেন প্যাটিস এবং পেল্লায় সাইজের তিনটি পান্তুয়া। এবার ওঠার পালা – এবং তখনি ঘনিয়ে এলো বিপদ।

আমি বলে উঠলাম “দারুন আড্ডাটা হলো রে! খুব ভালো লাগল”

সুমন: “তোদের সঙ্গে তো অনেক দিন পর দেখা – আমারও খুব ভালো লাগল। মাঝে মধ্যে এই রকম বসলে মন্দ হবে না – কি বলিস?”

আমি: “তা যা বলেছিস ! চল কালী পূজার সময় আবার বসি? তবে একটা কথা আমার মনে অনেক্ষণ ধরে খচ খচ করছে – এবারে বলেই ফেলি?”

সুমন: “নিশ্চই – এত ভদ্রতা করছিস কেন?”

আমি: “আমরা তোকে বিজয়ার ভালোবাসা জানালাম – আর তুই তো পাল্টা আমাদের বিজয়ার ভালোবাসা জানালি না?”

সুমন এবার রেগে গেল: “কি বললি ? আর একবার বল দিকি? ঠিক শুনছি কি না আর একবার যাচাই করে দেখি”

আমি: “আরে বাব্বা – বলছি আমাদেরকে বিজয়ার ভালোবাসা জানালি না তো?”

ব্যাস !! মনে হলো যেন বোমার সুতোতে আগুনটা লাগালাম – নিমেষের মধ্যে ফেটে পড়লো সুমন। সারা পাড়া কাঁপিয়ে তারস্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে বলতে থাকলো “হারামজাদা! শালা শুওর কোথাকার !! এখুনি বাড়ি থেকে বেরো – আর জীবনে যেন আমার বাড়ি আসবি না” !!!

আমি তো ব্যাপারটা বুঝতেই পারলাম না এত উত্তেজিত হবার কি আছে ! তবুও হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম এবং বাকি বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলাম “কি হলো ঘটনাটা ? পাগলা কুত্তার মতন অত চেঁচাচ্ছে কেন?”

অমিত আমাকে বোঝালো “জানিস তো কয়েক মাস আগে ওর বিয়ে হয়েছে বুড়ো বয়েসে। এবং যেহেতু ওর বৌ অতিরিক্ত সুন্দরী, সুমন সবসময় সন্দেহ করে সবাই ওর বৌ’এর দিকে তাকিয়ে আছে, সবাই ওর বৌয়ের সঙ্গে আলাপ করতে চায়, ইত্যাদি। এক কোথায় বেশ ইনসেক্যুরিটিতে ভোগে আর কি!”

আমি: “তার সঙ্গে এই ঘটনার কি সম্পর্ক শুনি? আমার তো ওর বৌয়ের সঙ্গে কথাও হয়নি – তাহলে এত রেগে যাবার কি আছে?”

অমিত: “ওর বৌয়ের নাম কি জানিস? ওর বৌয়ের নাম বিজয়া !! ওর বৌয়ের দিকে কেউ তাকালেই কেমন জ্বলে পুড়ে ওঠে – আর তুই শালা আবার চাইছিস “বিজয়ার ভালোবাসা” !!”

এর পর থেকেই আমি বিজয়ার সময় বোবা হয়ে থাকার চেষ্টা করি !

===============================================================

পুনশ্চ: সবাইকে জানাই শুভ বিজয়া – দয়া করে আবার বিজয়ার ভালোবাসা চেয়ে বসবেন না যেন !!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: