“ঠান্ডা নেই”

ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড দুরন্ত সমীর। স্কুলে গার্ডিয়ান কল হত প্রায় মাসে একবার করে। বন্ধু বান্ধবের মধ্যে ঝগড়াটা হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু প্রত্যেকবার যদি সেই ঝগড়া শেষ হয় হাতাহাতি দিয়ে, তাহলে তো একটু মুশকিল হবেই। সমীরের বাবাও আর পারেননি শাসন করতে – প্রত্যেকদিন ছেলেকে মেরে মেরে ওনার নিজের রাগ যেমন বাড়তে থাকে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রেসার ও চড়তে থাকে। শেষমেশ ডাক্তার বলেই দিলেন যে প্রেসার কাবুতে রাখতে হলে ছেলেকে কাবু করার আর চেষ্টা করবেন না।

সেই সমীর দশম ক্লাসের গন্ডি পেরিয়ে উঠে গেল কলেজের আওতায়। সবেমাত্র কলেজে ঢুকলে সবারই একটু করে পাখনা গজিয়ে ওঠে। আর সমীরের মতন ছেলেদের তো সেই পাখনা বিশাল আকৃতি যে নেবে, সে তো অবশ্যম্ভাবী। স্কুলের সেই অনুশাসনকে যে ভেঙে বেরিয়ে এসেছে, কলেজের স্বাধীনতা তো তার কাছে স্বর্গ। তাই এখন সমীর মাঝে মধ্যে একটু ক্লাস করে, বেশির ভাগ সময় কাটায় হয় কলেজের ক্যান্টিনে নয় কাছাকাছি সিনেমা হলে।

কোথায় কি সিনেমা চলছে, কোন সিনেমায় কে নায়িকা, কোনটাতে ভালো একশন আছে – সবই ওর একদম হাতের মুঠোয়। পড়াশোনাটা করে পাশ করার জন্য – এবং পাশ করেও যায়। সেই দিক থেকে কোনো চিন্তার কারণ নেই ওর বাবা মার। সব বিষয়ে মোটামুটি করে – শুধু ইংরেজি তে একটু বেশি টান। সাধারণত ছাত্রদের অঙ্ক পরীক্ষায় একটু বেশি বাথরুমে যেতে হয় টেনশনে, সমীরের সেই যাতায়াত হয় ইংরেজি পরীক্ষার সময়। সেটার উন্নতির জন্য আলাদা মাস্টারমশাই আছে – এমনকি স্পোকেন ইংলিশের জন্যও আলাদা ক্লাস করে। তা সত্ত্বেও ওখানেই সবচেয়ে বেশি ব্যাথা।

তা সেই সমীর একবার বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গেছে ধর্মতলার গ্লোব সিনেমা হলে। গ্রেগরি পেকের মাকেনাস গোল্ড। তখনকার মাটিনী শো শুরু হতো বেলা তিনটের সময়। তাই সাধারণত আরাইটের মধ্যে যাওয়াটাই প্রচলন ছিল। কিন্তু সমীর ওর বন্ধুদের জোর করে নিয়ে গেল বেলা একটার মধ্যেই। বন্ধুরা যত জিজ্ঞেস করে কেন এত তাড়াতাড়ি যেতে হবে, ততবার সমীর বলে “চল না আগে, ওখানে গিয়ে একটু ঘুরব”। বন্ধুরা ঠিক বিশ্বাস না করলেও ওরা পৌঁছে যায় ওই সময় নাগাদ।

ওখানে পৌঁছেই সমীর বলে যে গ্লোব হলে একটা বার আছে আর ওখানে ও বিয়ার খাবে। সেটা শুনেই ওর বন্ধুদের তো চক্ষু ছানাবড়া! বলে কি ছেলে? সবার সামনে বসে ও বিয়ার খাবে? ভয়ে কয়েকজন বলেই দিল যে ওরা ওখানে যেতে পারবে না।

আপনাদের মধ্যে যারা এটা পরে ভাবছেন যে একটা সতেরো বছরের ছেলের বিয়ার খাওয়াটা তো একদমই স্বাভাবিক আজকের দিনে – তাদের কি বলি যে ১৯৮৮ সালে ওই রকম জিনিস করতে হলে ভীষণ সাহস লাগে !!

বন্ধুরা যত বাধা দেয়, সমীরের গোঁ তত বেড়ে যায়। শেষ মেষ সবাই মিলে ভয়ে ভয়ে বারে ঢুকে পড়ে। একমাত্র সমীরের কোনো ভয় নেই – বরঞ্চ ও বাকিদের কে বলছে যে এটা কোন ব্যাপারই না, একদমই জলভাত!! একটা কোনার টেবিল দেখে বসতেই একজন চলে এল ওদের কাছে। গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করল ওদের কি লাগবে।

বাকিরা তৎক্ষণাৎ সমীরের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল যে ওর কিছু লাগবে, আর বাকিদের কিছুই চাই না। সমীর একটুও না ঘাবড়ে গিয়ে বলল “আমার জন্য একটা বিয়ার দিন”। যিনি অর্ডার নিতে এসেছিলেন, তিনি আপাদমস্তক মাপলেন সমীরকে। চোখের সামনে দেখলেন একটা হারগিলে রোগা বেঁটে বাচ্চা ছেলে, যার এখনো ভাল ভাবে গোঁফ ও ওঠেনি, সে অর্ডার দিচ্ছে বিয়ার – তাও আবার যেন ঠান্ডা হয়, সেইরকম একটা নির্দেশ দিচ্ছে। ততক্ষনে হাবভাব দেখে বন্ধুদের ঘাম বেরিয়ে গেছে – পালানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অর্ডার নেওয়ার ভদ্রলোক ঠান্ডা গলায় বললেন “আমরা তোমাকে বিয়ার দিতে পারব না। কারণ তুমি underaged”। সেই শুনে বাকি বন্ধুরা উঠে পড়ে, ঘাম মুছতে মুছতে বেরিয়ে যাবার জন্য রওনা দিয়েছে – এবং মনে মনে হাঁফ ফেলতে ফেলতে ভাবছে যে আজ একটা বিরাট ফাঁড়া কেটে গেছে ওদের।

হটাৎ শোনে সমীর বলছে “ঠান্ডা নেই? কোনো ব্যাপার না, আমাকে গরমই দিন”

“না না, তুমি underaged, তাই দিতে পারব না।”

“আরে বাবা! ঠান্ডা নেই তো কি হয়েছে – বলছি তো আমাকে গরম দিন”

অবশেষে একজন বন্ধু সমীরের কানে underaged এর মানেটা বলাতে ও গালি দিতে দিতে বেরিয়ে গেল – সিনেমাটা পর্যন্ত দেখলো না !!!!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: