ছোট বাথরুম

সেই বছর অফিসের কাজে এদিক ওদিক খুব ঘুরতে হচ্ছে। একদিকে যেমন নতুন জায়গা বা নতুন শহর দেখার আনন্দ থাকে, অন্যদিকে একটা ক্লান্তিও চলে আসে যদি সপ্তাহে প্রায় তিন দিন বাইরে থাকতে হয়। তা নতুন একটা শহরে পৌঁছেছি বরফ পড়ার মধ্যে। সালটা হবে বোধহয় ২০১৩। একে ল্যাজ বিশিষ্ট বাঙালি যারা ১৭ ডিগ্রী তে মাংকি কাপ পড়তে দ্বিধা করে না, তার মধ্যে আবার যাকে বলে হ্যারিকেন টুর – নিঃশাস ফেলার টাইম থাকে না যেখানে। সেই ভোর তিনটেতে উঠে তৈরী হয়ে রওনা দেয়া, সারাদিন অফিসের মিটিং করা, এবং সন্ধ্যে সাত’টার ফ্লাইট ধরে আবার ফেরা।

তাই সকাল থেকেই মেজাজটা খিচড়ে আছে – নিম পাতা চেবানোর পর যেই রকম হয়, একদম সেই রকম। এখন দয়া করে বলবেন না যে আপনার আবার নিম পাতা খেতে খুব ভালো লাগে ! পাল্টা আমাকে তখন বলতেই হবে যে আপনি তাহলে অনায়াসে হাঁসতে হাঁসতে মানুষ কেন, নিষ্পাপ শিশুকেও খুন করতে পারবেন !

যাই হক, মিটিং টা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়াতে ভাবলাম এয়ারপোর্ট’এ আগে চলে যাই – বিশেষ করে বাইরে যখন অবিরাম বরফ পরে চলেছে এবং তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৪ / ৫ ডিগ্রী। এয়ারপোর্ট’এই নাহয় একটু কফি খেয়ে নিয়ে গান শুনতে শুনতে ফ্লাইটে উঠে পড়ব। যেই রকম ভাবনা, সেই রকম অ্যাকশন নিয়ে নিলাম। বিকেল ৫ টা নাগাদ এয়ারপোর্ট চলে এসে সটান চলে গেলাম কফি শপ’এ – যদিও পাশের বিয়ার পাবটি আমাকে হাতছানি দিচ্ছিল বিচ্ছিরি ভাবে।

একটা গরম কফি খেয়ে শরীরে এনার্জি চলে এলো। অল্প এক নম্বর করেও নিলাম – শরীরটা হাল্কা থাকলে মনটাও হাল্কা থাকে। কানে কিশোরে কুমারের গান গুঁজে দিয়ে এয়ারপোর্ট টা ঘুরতে লাগলাম। তারপর সময় হতেই গেটের দিকে যেতে গিয়ে একটু ঘেঁটে গেল – ভাবলাম একজনকে জিজ্ঞেস করি লিফ্ট’টা কোথায়। সামনেই একজন জেঠু মতন পেয়ে গেলাম। ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম লিফ্ট কোথায় পাবো – উনি সামনের দিকে দেখিয়ে দিলেন একটা বোর্ডের দিকে।

Cropped

আমি ওটা দেখে বেশ চটে গেলাম। ওনাকে বললাম যে আমি আপনার ভাইপোর মতন হতে পারি, কিন্তু এই রকম রসিকতার মানে কি? উনিও অবাক হয়ে বললেন যে উনি তো রসিকতা করছেন না – বরঞ্চ ঠিক জায়গার দিকেই নির্দেশ দিচ্ছেন। আমি একটু চুপ করে ভাবলাম যে উনি সত্যিই আমার উপকার করতে চাইছেন – নইলে কেনই বা জানতে চাইছেন আমার ছোট বাথরুম পেয়েছে কি না (যাকে চলতি বাংলায় বলে হিসি পেয়েছে কিনা) !

আমি লজ্জিত মুখ করে ওনাকে বললেন যে আমি একটু আগেই ওই কাজটা করে এসেছি – এখন ট্যাঙ্ক একদমই খালি – তাই ওইটা নিয়ে চিন্তা না করলেও হবে। শুধু একটু লিফটের ডিরেকশনটা দিয়ে দিলেই আমি ওনাকে “অসংখ্য ধন্যবাদ” বলে এগিয়ে যাব।

উনি এই শুনে খুব রেগে গেলেন। ওনার লোকাল ভাষায় কি সব বললেন – কিছুই বুঝলাম না, শুধু কেমন যেন মনে হলে আমার বাপ্ বাপান্ত হচ্ছে প্রচন্ড বেগে। শেষ এর একটা ইংরেজি শব্দে আমাকে বাস্টার্ড উপাধি দিয়ে উনি গট গট করে চলে গেলেন। আমি তখন খেপে আগুন – মাতৃভাষায় চোখাচোখা শব্দ প্রয়োগ করতে যাব উনার উদ্দেশে, তখন’ই পুরো সাইনবোর্ডটা চোখে পড়লো।

Full picture

মাথা নিচু করে ওনাকে রিমোট ধন্যবাদ দিয়ে প্লেনের দিকে হাঁটা মারলাম …..

  1. সুমন্ত রায় চৌধুরী October 14, 2018 at 11:40 am

    ভালো লাগলো পড়ে, চালিয়ে যা 💐

    Reply

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: