কপালের নাম গোপাল !!

বাংলায় একটা প্রচলিত কথা আছে – চাঁচা, আপন প্রাণ বাঁচা ! খুবই দামি কথা এবং আমি সেটা মনে প্রাণে উপলব্ধি করি। সেই জন্য চলচিত্রের শুরুতে যেমন একটা লেখা দ্রুত বয়ে যায়, সেই ভাবেই প্রথমেই বলে রাখি যে এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক – এদের সঙ্গে জীবিত কারুর মিল খোঁজার চেয়ে আপনি হয় হোয়াটস্যাপ এ অন্যের নিন্দা করুন বা ফেসবুকে অন্যের “সাফল্যের” ছবি দেখে জ্বলে পুড়ে মরুন !!

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়, প্রায় তিরিশ বছর আগেকার কথা। এই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ব্যাপারটা বেশ মজার – কারণ ক্লাসরুম এর চেয়ে বেশি সময় কাটানো হতো ক্যান্টিনে বা কাছাকাছি সিনেমা হলে। তার ফলে কিছু কিছু বিষয়ে ছাত্রদের জ্ঞান মারাত্মক মাত্রায় থাকে – বিশেষ করে যাকে আমরা বলতাম “নন-ডিপার্টমেন্টাল” বিষয়। অথচ পরীক্ষায় তো পাশ করতেই হবে – তাই একটা অহেতুক চাপ সৃষ্টি হতো। এই বাজে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ছিল একটা উপায় – ক্লাস টেস্টে যদি ভালো নম্বর তুলতে পারো, তাহলে সেমেস্টার পরীক্ষায় শুধু আড্ডা মেরে আর তাস খেললেও কোনো চাপ থাকবে না। তাই এই ক্লাস টেস্টের জন্য লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়তো বিভিন্ন ভাবে – হয় দারুন হারমোনিয়াম তৈরি করার শিল্পে মেতে উঠছে, নয়তো ক্লাসের সাদা দেয়ালে অজন্তা ইলোরা র পেইন্টিং এর মতন লেখাতে ব্যস্ত থাকতো সকাল বিকেল, নইলে বিভিন্ন লোকেদের সঙ্গে আলোচনায় বসা – এইবার উৎরে দিলে এক মাসের সিগারেট খরচ।

 

গৌরব বলে এক রঙ্গীন বন্ধু আমাদের ছিল সেই সময়। ক্যান্টিন, কলেজের মাঠ, হোস্টেলের ঘরে নানাবিধ জল নিয়ে গবেষণা, নতুন কোন সিনেমায় কোন সিন টা দেখার মতন – এই সব বিষয়ে খুবই পারদর্শী। কিন্তু বিধাতার নিষ্ঠুর বিধান – এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষার ব্যাপারে কোন ছাড় নেয়। এবং সে ইলেকট্রনিক্স এর প্রথম ক্লাসটেস্ট এ আর্যভট্ট কে খুব সম্মান দিয়েছিলো বিরাট একটা শূন্য পেয়ে! তাই পরের ক্লাসটেস্ট ছিল একদম করেঙ্গে ইয়াহ মরেঙ্গে র মতন। চাপ বাড়লে ওর আবার নিম্নচাপও বেড়ে যায় – কোন রকমে ওষুধ খেয়ে দ্বার বন্ধ রেখেছে – নইলে যখন তখন তিতলি ঘূর্ণিঝড় এর মতন হাওয়া এবং বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে।

পরীক্ষার দিন তিনেক আগে নেমে গেল প্রচারে – ভালো ভালো ছেলেদের ধরে ধরে একের পর এক লোভনীয় অফার – হয় সিগারেট, নয় রঙ্গীন জলের খরচ, নয় তো একদম টানা দুই মাসের প্রক্সি দেবার প্রতিশ্রুতি। তখন নেহাত ফ্লিপকার্ট বা আমাজন দেশে আসেনি – এলে অবশ্য পালাতো – ওদের এই রকম অফার দেয়া একদম অসাধ্য !! যায় হোক, বিতনু আর কাটাপ্পা রাজি হয়ে গেল। এরা দুজন ছিল ক্লাসের প্রথম আর দ্বিতীয় ছেলে। তাই গৌরব আনন্দে আত্মহারা – একই টিমে মেসি আর রোনালদো কে সই করিয়েছে – চাট্টি খানি কথা নয়। ম্যাচে ৫ গোল দেবেই দেবে – পুরো ৪৫ এ ৪৫ ই পাবে – এই ব্যাপারটায় কোন সন্দেহ ছিল না।

পরীক্ষার দিন – গৌরব মাঝে, এক পাশে বিতনু আর এক পাশে কাটাপ্পা। পেপার এলো – দুটি অঙ্ক করতে হবে – ২২.৫ করে এক একেকটির নাম্বার – সময় ৪৫ মিনিট। এ তো মেসি রোনালদো কে নিয়ে ভারতের আই লিগে খেলার মতন – একদম যাকে বলে জল ভাত ! গৌরব আবার গুণী জনদের খুব সম্মান করে – তাই বিতনু আর কাটাপ্পা কে সমান পরিমানে ইজ্জত দিল – দুজনের কাছ থেকে একটি করে অঙ্ক টুকে ৩০ মিনিটেই খাতা জমা করে বেরিয়ে এল। রাজ্য জয়ের পরে ওর সেকি উৎসাহ – বাকিদের দিচ্ছে আওয়াজ, আমিও ভিড়ের মধ্যে থেকে বিনা পয়সায় সত্যেনদার বিখ্যাত তেলে পোড়া কালো লুচি আর আলুরদম খেয়ে পেট ভর্তি অ্যাসিড নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

দুই দিন পরে রেজাল্ট ঘোষণা করবেন মাস্টার মশায় – বাকিরা চিন্তিত থাকলেও গৌরব একদমই নিশ্চিন্ত। নিম্ন চাপের প্রব্লেম ও আর নেই – বরঞ্চ বাকিরা ছোটাছুটি করছে বাথরুমের দিকে। শীষ দিতে দিতে ক্লাসে ঢুকলো গৌরব, সাথে বিতনু আর কাটাপ্পা।

মাস্টার মশায় রেজাল্ট বলা শুরু করলেন … অনেকের রেজাল্ট বলার পর উনি বললেন:

বিতনু : ২২.৫
কাটাপ্পা: ২২.৫
গৌরব: ০

সেদিন বহু রাত অব্দি সত্যেনদায় শোনা যাচ্ছিলো গৌরবের গলা – “একটা অঙ্ক ও ঠিক করে করতে পারে না শালা xxxxxx ( ছাপার অযোগ্য ভাষা ), আর আমিও একটা আস্ত xxxx – একজনের কাছ থেকে টুকলেও ২২.৫ পেয়ে বাড়ি ফিরতাম !!! শালা xxxxxxxxxxxx xxxxxxxxx …. ( ছাপার অযোগ্য ভাষা ) “

  1. দারুন। কিন্তু নামটা কাটাপ্পা? এ তো আবার অন্য গল্প হয়ে গেল—

    Reply

    1. আসলে তখন কাটাপ্পা ছাড়া আর কিছু মাথায় আসছিল না 😁😁😁

      Reply

  2. […] কিন্তু ওই নন-ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষায় তো পাশ করতে হবে ! তার জন্য ক্লাসটেস্টই ভরসা ছিল – ভালো নম্বর কোনোভাবে পেয়ে গেলে নিশ্চিন্ত। তার জন্য যা করণীয়, সেটা করতে হবে। কারুর বা বন্ধুপ্রীতি বেড়ে যেত ওই সময়, কেউ বা পরীক্ষার আগে রাত জেগে হারমোনিয়াম তৈরি করতে ব্যস্ত থাকতো, কেউ বা বাথরুমের পায়খানার সিস্টার্ন’এ প্লাষ্টিক জড়িয়ে বই পত্তর রেখে আস্ত। বন্ধুপ্রীতি আবার অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে থাকে, সেটা আগের একটা গল্পে বলেছিলাম। গৌরবের ওই কষ্টের কথা পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন। […]

    Reply

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: